বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম:
হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকে তারা; তবুও সত্যের কলম থামে না

হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকে তারা; তবুও সত্যের কলম থামে না

সাংবাদিকদের পাওয়া না পাওয়ার জীবন

হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকে তারা; তবুও সত্যের কলম থামে না

 

শেখ শাহাউর রহমান বেলাল::

গত কয়েকদিন আগে কক্সবাজারে স্যাটেলাইট টিভি আনন্দ টিভি’র প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। সেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সাংবাদিকরা অংশ নেয়। আমি হবিগঞ্জ জেলা থেকে অংশ নিয়েছিলাম। সেই সম্মেলনে এমন সাংবাদিকরা অংশ নিয়েছিলেন যাদের সাংবাদিকতার বয়স ২০ থেকে ৪০ বছর। অনেকেই ছিলেন মফস্বলের গুণী সাংবাদিক। সেখানে জুনিয়র হিসেবে প্রায় সবার সাথেই একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। সবাই সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা করেছিলেন। সেখানে একজন সিনিয়র সাংবাদিকের কিছু কথা শুনে আমি পুরো হতভম্ব হয়েছিলাম। তিনি প্রায় চোখের পানি ছাড়া অবস্থায় কথাগুলো বলেছিলেন। সিনিয়র ঐ সহকর্মী বলেছিলেন, সাংবাদিকের দিন কাটছে আজ খুবই করুণ অবস্থায়।

তিনি বললেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা চাকরি থেকে অবসরে গেলে কোটি টাকা পান, কেউ দেড় কোটি আবার কেউ ৭০/৯০ লাখ টাকাও পেয়ে থাকেন। তারা পেনশন পান। অতচ আমরা সাংবাদিকদের জন্য কোন সুযোগ-সুবিধাই নেই। ঠিকমত বেতন নেই, ভাতা নেই, পেনশন নেই। আমাদের ছেলে- মেয়েরা প্রশ্ন করে বাবা! অবসরে গেলে তুমি কত টাকা পাবে? তাদের উত্তর দিতে পারি না। শুধু অবাক হয়ে থাকিয়ে থাকতে হয়।

সিনিয়র এ ভাইয়ের কথা শুনে আমি নিজেও অবাক হয়ে থাকিয়ে রইলাম। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললাম। আসলে তো ঠিক। তার মুখে কথাগুলো শুনে নিজেকে খুব ছোট মনে হলো, অসহায় লাগলো।

কেন এ অবস্থা আমাদের? সারাজীবন ভালোবেসে এ পেশায় কাজ করে একজন সাংবাদিকের কেন কোন সঞ্চয় থাকবে না? কেন নিশ্চিন্ত মনে তারা কোটি বা লাখ টাকা নিয়ে অবসরে যেতে পারবেন না? কেন মধ্যবয়সে একজন সাংবাদিককে খালি হাতে মলিন মুখে বাড়ি ফিরতে হবে? কেন তার স্ত্রী আর সন্তানরা চিন্তিত মুখে থাকবেন ভবিষ্যৎ নিয়ে? কপালে দ্রুত বলিরেখা পড়বে তাদের?

আমরা যারা বেসরকারি গণমাধ্যমে কাজ করি, বেশিরভাগ সাংবাদিকদের একই অবস্থা। কি পত্রিকা, কি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম। সব জায়গায় একই অবস্থা। কয়েকটি সংস্থা বা অফিস অবশ্য কিছু কিছু ভাতা দেয়ার নিয়ম চালু করেছে। তবে বেশিরভাগ অফিসেই তা নেই।

মাস শেষে কয়েকটি টাকা হাতে পাবার আশায় রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে প্রতিদিন আমাদের অফিস করতে হয়। পরিবার সন্তানদের সঙ্গে কাটে না মধুর সময়! দেখা হয় না বসন্তের বিকেল! চাকরিরও কোনো নিশ্চয়তা নেই একজন সাংবাদিকদের। সব সময় সবাইকে থাকতে হয় দুরুদুরু বুকে। এই বুঝি গেল! পছন্দ না হলে, মতের মিল না হলে, তেলবাজি না করতে পারলে এক সময় তা চলেও যায়। চাকরির নিশ্চয়তা না থাকায় মনোযোগ দিয়ে কাজও করতে পারেন না তারা। সৃজনশীলতা চাপা পড়ে যায় লাল ইটের নিচে। জীবনের জটিলতায় বেকার হয়ে পড়েন নামকরা সাংবাদিকরাও। এ হাউস ও হাউস ঘুরে বেড়ান সংবাদকর্মীরা। কখনও কারও চাকরি হয়। কখনও হয় না। ক্লান্ত পায়ে, ঘামে ভেজা শার্টে অনেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। চুপচাপ বসে থাকতে হয় কোন ক্লাবে বা গাছের নীচে! কখনওবা উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে থাকেন রাজপথে। মেয়েদের অবস্থা আরও করুণ। অনেক অফিস বলেই দেয় মেয়েদের তারা চাকরি দেবেন না। একটু সিনিয়র হয়ে গেলেই তাদের আর জায়গা হয় না কাজে। চলে যেতে হয় পেশা ছেড়ে। দেশের কথা ভেবে দেশকে অনেক ভালোবেসে, মমতা মাখা মন নিয়ে এ পেশায় আসা হয়। আমরা দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করতে চাওয়াটাকি অপরাধ!

সাংবাদিক মানেই যেন দুঃখময় জীবন! জীবনে কোন সখ আহ্লাদ থাকবে না, জীবনে যেন কোন সচ্ছলতা থাকবে না। ঘরে ভাত থাকবে না, পোশাক থাকবে মলিন। ছেলে-মেয়েদের কোন সখ পুরণ করতে পারেন না সাংবাদিক বাবা কিংবা মা। অসহায় চেহারা দেখে করুণা জাগে মানুষের। সমাজ রাষ্ট্র ধরেই নেয় আমাদের অভাব থাকাই যেনো নিত্যসঙ্গী। বাড়িতে বউয়ের মুখ থাকে মøান। একটা ভালো জামার জন্য কান্না করে ঘুমিয়ে পড়তে হয় ছেলে মেয়েদের। সেই অভাবী রূপী সাংবাদিকদের আজও দেখে আসছি দু’চোখ জুড়ে। হাজারো সাংবাদিকদের মধ্যে হয়তো দু’একজন সাংবাদিকের অবস্থা ভালো। বাকি সবার অবস্থাই কম বেশি খারাপ। তারা অসহায় আর মানবেতরভাবে জীবন নামের তরী চালাচ্ছে। কিভাবে বেঁচে আছে তারা? বলতে হবে সাংবাদিকরা হাওয়া খেয়ে বেঁচে আছে!

আজকের সমাজে সাংবাদিকদের আর্থিক অনটন যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। মনখারাপ হয়ে যায় তাদের দেখলে। সারাজীবন যারা সমাজ, মানুষ, রাষ্ট্রকে সচেতন করেছেন, তুলে ধরেছেন নানা অসঙ্গতি, দুর্নীতির চিত্র, তাদের সংসার আজ অচল। তাদের তো টাকার দরকার নেই। কি করবে টাকা নিয়ে তারা! কলম থাকলেই তো হলো। কোন পেশায় দুস্থ বলে ভাতা দেয়া হয় কিনা জানি না। কিন্তু আজ দুঃখের সাথে বলতে হয়, সাংবাদিকতা পেশায় দুস্থ অসহায় ভাতা দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে! এ দয়া কি একজন সাংবাদিকের প্রাপ্য? কেন তাকে করুণা করবে রাষ্ট্র সমাজ? তিনি যদি অন্য সরকারি বেসরকারি পেশার মতো সম্মানজনক বেতন পেতেন, তার যদি অবসর ভাতা থাকতো তাহলে এই দুস্থ ভাতা হাত পেতে নিতে হতো না তাকে। এই ভিক্ষা কেন নিতে হবে তাকে? সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবার অধিকার তো তারও আছে!

অনেকেই আজ অনেক সাংবাদিককে হলুদ সাংবাদিক বলেন। কেন তাকে হলুদ সাংবাদিক বলেন? সাংবাদিকদের নীতিতো এটা না। হ্যাঁ মানছি গুটা কয়েকজন সাংবাদিক হয়তো এমন হতে পারে। তাদের জন্য আইন আছে। কিন্তু এটাও মানতে হবে বেশিরভাগ সাংবাদিকই সৎভাবে জীবন যাপন করেন। করার চেষ্টাও করেন। আর কত দুস্থ শব্দ মাথায় নিয়ে একজন সাংবাদিককে বাঁচতে হবে।

এরকম ভুড়ি ভুড়ি সাংবাদিকদের ঘটনা আছে। এসব পরিবারের কষ্টের গল্প কেউ কি জানেন? কেমন আছে কষ্টে থাকা সাংবাদিক পরিবার। আমারও জানা হয়না নাম না জানা কিংবা আমাদেরই ভুলে যাওয়া কোন সহকর্মীর পরিবার! আবার সম্মান বাঁচাতে অনেকেই সেসব গল্প বলেন না। কিন্তু সাংবাদিকরা আজ সবাই যদি অবসর ভাতা পেতেন, তাহলে আর্থিক ভরসা থাকতো এসব পরিবারগুলোর। টাকা অনেক মানসিক শক্তি জোগায়। স্বপ্ন বাঁচায়।

দুঃখের বিষয় হলো আজ যদি চাকরি চলে যায় তাহলে খালি হাতে চলে যেতে হবে। শুধু চলতি মাসের বেতন নিয়ে। আমরা কিভাবে চলবো বুড়ো বয়সে? আমাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা শেষ করবে কিভাবে? সংসারই বা চলবে কিভাবে? এর উত্তর কি কেউ দিতে পারবেন?।

মিডিয়ার মতো এত দ্রুত চাকরি চলে যাওয়ার নজির আর কোন পেশাতে নেই। প্রায় সময়ই অফিসে গিয়ে দেখতে হয় চাকরি নেই। কোন নোটিশ ছাড়াই আমাদের নিতে হয় অব্যাহতি। সংসার চালাতে হয় ধার-দেনা করে। হৃদয়ে জমে থাকা টুকরো টুকরো কথাগুলো বিষন্ন বাতাস হয়ে তখন যেনো ভেসে বেড়ায় আমাদের চারপাশ। আমরা লজ্জায়-বেদনায় নুয়ে পড়ি! দুঃখ-কষ্টে খাটে আমাদের জীবন। প্রতিদিনই দেখতে হয় চেনা, কথা বলা সুখ-দুঃখের সব সাংবাদিক বন্ধুদের মায়াময় কিছু মলিন মুখ!

পকেটে টাকা নেই, সংসার চলেনা। তবুও লোভ-লালসা, হিংসা-নিন্দাকে পরিহার করে মনে আনন্দ উল্লাস নিয়ে সত্যের কলম আমাদের থামে না! কি এক ঘোর লাগা জীবনের মায়ায় পড়ে কেটে যায় আমার মতো হাজারো সাংবাদিকের সারাটা জীবন। সাংবাদিকদের সংগঠন বা রাষ্ট্র কি কখনো এগিয়ে আসবে এসব সমস্যা সমাধানে? নাকি যেভাবে চলছে সেভাবেই চলতে থাকবে সাংবাদিকদের পাওয়া না পাওয়ার জীবন! হাওয়া খেয়েই বেঁচে থাকবে আমাদের জীবন!

 

লেখক:

সাংবাদিক, কলামিষ্ট  ও মানবাধিকারকর্মী

সম্পাদক ও প্রকাশক: সাপ্তাহিক চেকপোস্ট (প্রিন্ট)

দৈনিক চেকপোস্ট (অনলাইন)

Print Friendly, PDF & Email

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 Checkpost Media
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!