শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস ও আমাদের করণীয়

ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস ও আমাদের করণীয়

ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস ও আমাদের করণীয়

মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ ছগীর আহমদ আলক্বাদেরী

بسم الله الرحمن الرحیم
نحمده ونصلی ونسلم علی رسوله الکریم اما بعد:

এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বড় দেশ চীন। দেশটিতে করোনাভাইরাসে সূত্রপাত । এ পর্যন্ত  মারা গেছ বহু মানূষ। ১৬৬ টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস।

এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে অনেক তথ্যই সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, ‘চীনারা ইঁদুর, বাদুড়, কুকুর, বিড়াল জাতীয় বন্যপ্রাণী খাওয়ার কারণে এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে। এ ধরনের রোগকে

আরবিতেطاعون.বা,مرض متعدیবা وباء বলা হয়।
করোনাভাইরাস ছড়ানোর কারণ যাই হোক হাদিসে অপরিচিত মহামারী ছড়িয়ে পড়ার যে কারণ উল্লেখ রয়েছে তাহলো- ‘অশ্লীলতার ভয়াবহ সয়লাব। মহামারী ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অশ্লীল কাজে লিপ্ত হওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে।

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কোনা জাতির মধ্যে অশ্লীলতা-বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়বে তখন তাদের মধ্যে এমন এমন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি।’ (ইবনে মাজাহ)

মহামারী দেখা দিলে করণীয়ঃ
যখন কোনো জনপদে অপরিচিত মহামারী দেখা দেয় তখন মানুষের জন্য ইসলামের দিক-

নিদের্শনা হলো-
তাওবা ইস্তিগফার করা, আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তাকদীরের উপর খুশী থাকা। সাওয়াবের আশা নিয়ে ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহর কাছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে বেঁচে থাকতে সাহায্য চাওয়া।’

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উম্মতকে এসব অবস্থায় সান্ত্বনা দিতেন।

হাদিসে এসেছে-
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন, ‘মহামারি আল্লাহ তাআলার একটি শাস্তি। তবে তা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর রহমত।’ (বুখারি)

যারা আল্লাহ তাআলার উপর অগাধ আস্থা এবং বিশ্বাস রাখে, সেসব লোকের পায়ে যদি কোনো কাটাও ফুটে, তবে তারা আল্লাহর কাছে এর বিনিময় পাবে। সুতরাং যারা মাহামারীর ভয়াবহ অবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধারণ করবে তাদের জন্য এটি মহামারি নয়। এদের জন্য এটি আল্লাহর রহমত। এর মাধ্যমে তাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন।

সব সময় এ দোয়াটি পড়া-
اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَ الْجُنُوْنِ وَ الْجُذَامِ وَمِنْ سَىِّءِ الْاَسْقَامِ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাচি ওয়াল জুনুন ওয়াল ঝুজাম ওয়া মিন সায়্যিল আসক্বাম।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি শ্বেত রোগ থেকে আশ্রয় চাই। মাতাল হয়ে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই। কুষ্ঠু রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে আশ্রয় চাই। আর দূরারোগ্য ব্যাধি (যেগুলোর নাম জানিনা) থেকে আপনার আশ্রয় চাই।’

তিরমিজিতে এসেছে, আরও একটি দোয়া পড়তে বলেছেন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاَقِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ وَ الْاَدْوَاءِ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্বি ওয়াল আ’মালি ওয়াল আহওয়ায়ি, ওয়াল আদওয়ায়ি।’
অর্থ : হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার কাছে খারাপ (নষ্ট-বাজে) চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা এবং বাজে অসুস্থতা ও নতুন সৃষ্ট রোগ বালাই থেকে আশ্রয় চাই।’ (তিরমিজি।

এবং পাক পাঞ্জতন নামের ওয়াসিলা সম্বলিত দোয়াটি পাঠ করবেন ঃ

لي خمسة أطفي بها حر الوباء الحاطمة
المصطفى والمرتضى وابناهما والفاطمة

লি খামছাতুন উতফি বিহা হাররাল ওয়াবায়িল হাতিমাহ
আলমোস্তফা ওয়াল মুরতাদ্বা ওয়াবনাহুমা ওয়াল ফাতিমা।

সুরা ফাতিহা, আয়াতে শিফা,আয়াতে সালাম,ও দরুদ শরীফ,সব সময় পাঠ করে নবী,অলি,ও মক্বামাতে মুক্বাদ্দাসার ওয়াসিলা নিয়ে দোয়া  করা
আয়াতে শিফাঃ
ويشف صدور قوم مؤمنين
وشفاءٌ لما في الصدور وهدًى ورحمة للمؤمنين
يخرج من بطونها شرابٌ مختلفٌ ألوانه فيه شفاءٌ للناس
وننزل من القرآن ما هو شفاءٌ ورحمة للمؤمنين ولا يزيد الظالمين إلاّ خساراً
وإذا مرضت فهو يشفين
قل هو للذين آمنوا هُدى وشفاء

আয়াতে সালামঃ

سَلَامٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ
سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ
سَلَامٌ عَلَىٰ نُوحٍ فِي الْعَالَمِينَ
سَلَامٌ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
سَلَامٌ عَلَىٰ مُوسَىٰ وَهَارُونَ
سَلَامٌ عَلَىٰ إِلْ يَاسِينَ
سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوهَا خَالِدِيىٰ
سلام هی حتی مطلع الفجر
পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাইতে হবে,

খতমে বুখারী, মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসুল,শিফা, খাজেগান ও গাউসিয়া ইত্যাদি বরকতমন্ডিত আমলের আয়োজন করতে হবে।
আহলে সুন্নাত ওয়ালজামাত এর মতাদর্শ বিরোধী সকল আক্বীদা বর্জন করতে হবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নির্দেশনা অবশ্যই মানতে হবে, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া আইন কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

সুতরাং কোনো অঞ্চলে মহামারী দেখা দিলে সেখান থেকে পালিয়ে না যেয়ে ওই অঞ্চলেই ধৈর্যধারণ করে বসবাস করা। যারা সে অঞ্চল থেকে না পালিয়ে ধৈর্যধারণ করে অবস্থান করবে, যদি তারা সেখানে মারাও যায়, এটি হবে তার জন্য শহিদি মৃত্যু।
কারণ

عن سعد رضی الله عنه عن النبی صلی الله عليه وسلم، قال: إذا سمعتم بالطاعون بأرض فلا تدخلوها وإذاوقع بأرض وأنتم بها فلا تخرجوا منهارقم:

যখন কোনো এলাকায় মহামারি ছড়িয়ে পড়ে তখন যদি তোমরা সেখানে থাকো তাহলে সেখান থেকে বের হবে না। আর যদি তোমরা বাইরে থাকো তাহলে তোমরা সেই আক্রান্ত এলাকায় যাবে না।’ (বুখারি, মুসলিম হাদিসে প্রিয় নবি

ঘোষণা করেন-
‘আমার উম্মত কেবলই যুদ্ধ ও মহামারীতে ধ্বংস হবে।’

তাই যে এলাকায় মহামারি ছড়িয়ে পড়বে সেখানে অবস্থান করে যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে শহিদ বলে আখ্যায়িত হবে। আর মহামারী এলাকা থেকে যে পালিয়ে আসবে তাকে জেহাদ থেকে পলায়নকারীর মতোই গণ্য করা হবে।

যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের সঙ্গীসাথীদের সহযোগিতা না করে পলায়ন করাকে হাদিসে যেমন কবিরা গোনাহ আখ্যা দেয়া হয়েছে তেমনি কুরআনে জেহাদ থেকে পলায়নকারীকে আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হওয়ার ধমকি শোনানো হয়েছে। তাই মহামারী আক্রান্ত এলাকা থেকে পলায়ন করা জেহাদ থেকে পলায়ন করার মতই।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত এলাকার মানুষের জন্য এ বিধান। ভাইরাস আক্রান্ত এলাকা থেকে যেমন কেউ পালিয়ে অন্যত্র যাবে না তেমনি বাহিরের অঞ্চল থেকেও ভাইরাস আক্রান্ত এলাকায় যাওয়া ঠিক নয়। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন।
এ সবই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ। এ নির্দেশ পালনে কারণ না খুঁজে প্রথম তার নির্দেশ পালন করাই মুসলমানের অন্যতম কাজ।’

ইসলাম সব বিষয়ই মধ্যপন্থা শিক্ষা দেয়। মহামারির ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা তাই যা প্রিয়নবি ঘোষণা করেছেন। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ওলামায়ে কেরাম। তারা বলেছেন-

যদি মহামারী আক্রান্ত এলাকার লোকজন পলায়ন করে অন্যত্র চলে যায় তবে যে সব লোক মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সেবা-শুশ্রূষা কে করবেন?

সম্পদশালী ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও গরিব অসহায় ব্যক্তিরাতো পালাতে সক্ষম হবে না।

যদি কেউ মনে করে যে, তাকে এ ভাইরাস বা রোগে এখনও আক্রমণ করেনি, তাই সে পালিয়ে যাবে। আর যদি ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে যায়, তবে সে যে এলাকায় যাবে সে এলাকার মানুষও তার মাধ্যমে সংক্রমিত হবে।

আবার অন্য এলাকা থেকে যদি কোনো সুস্থ মানুষ আক্রান্ত এলাকায় আসে তবে সেও এ ভাইরাস বা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে।

সুতরাং মুমিন মুসলমানসহ সব মানুষেরই প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ হাদিসের ওপর আমল করাই শ্রেয়।

আল্লাহ তাআলা বাংলাদেশ সহ সকল মুসলিম উম্মাহকে করোনাভাইরাসসহ যাবতীয় মহামারীতে ইসলামের দিক-নির্দেশনা মেনে চলার তাওফিক দান করুন।আমাদেরকে এ মহান বিপদ থেকে রক্ষা করুন, আমিন বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল মুরসালীন।

 

মুফতি মাওলানা মুহাম্মাদ ছগীর আহমদ আলক্বাদেরী

আরবি প্রভাষক: মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বন্দর,চট্টগ্রাম।
খতিব: মসজিদে গাউসুল আজম,লোহার পুল, মধ্যহালিশহর,বন্দর,চট্টগ্রাম।

Print Friendly, PDF & Email

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 Checkpost Media
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!