সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৫৬ অপরাহ্ন

কিছু কথা: শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন থেকে কেন সরে দাঁড়ালাম

কিছু কথা: শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন থেকে কেন সরে দাঁড়ালাম

কিছু কথা: শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন থেকে কেন সরে দাঁড়ালাম

* শেখ শাহাউর রহমান বেলাল *

 

রাজনীতি সচেতন হলেও আমি কখনই সরাসরি দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। ছিল না কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ সে তো অনেক দূর। এরপরও জীবনে কিছু সময় আসে, মানুষ উদ্বুদ্ধ হয়। মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না জন্ম নেয়। অবচেতন মন জেগে উঠে, সবাইকে জানান দিয়ে বলতে চায়, অনেক হয়েছে; এবার কিছু একটা কর। এভাবেই আমার ‘ডাক’ আসে।

সমাজ সেবক হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ডাক। প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও পরে মন সায় দেয়। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে থাকি। আড়মোড়া কাটিয়ে যে কয়েকজন মানুষের অনুপ্রেরণায় আমি জীবনের বাঁক বদলের এতবড় এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তারা আমার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন আমার বাবা। কৌশলগত কারণে বাকিদের নাম নাই বললাম। তবে তাদের কাছেও আমি চির কৃতজ্ঞ। এরা প্রত্যেকেই চেয়েছিলেন আমি নবগঠিত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেই। মনোনয়ন নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী খরচের সব আয়োজনের আশ্বাসও দিয়েছিলেন তারা। কোনো যোগ্যতা না থাকার পরও একমাত্র আমার বাবা-মা, স্ত্রী সন্তানদের কারণে আমি ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে যাচ্ছিলাম। বাবা-মা সমতুল্য এ দুটি মানুষ এমনভাবে আমাকে ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধেছেন, এ তারই বর্হিঃপ্রকাশ।

আমার বাবা এক সময় ৭নং নুরপুর ইউনিয়ন থেকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন পুরোপুরিভাবে আমি আমার বাবাকে উৎসাহ দিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আর হয়ে উঠেনি। একতার ডাক সেদিন থামিয়ে দিয়েছিলো বাবার নির্বাচন করা। সেদিন বাবা আমাকে ফোন করে একটাই কথা বলেছিলো সরি বাবা, সরি। আমি পারলাম না, তবে তুমি একদিন পারবে- এটাই আমার বিশ্বাস।

আমার নির্বাচন করার আরেক কারন ছিলো- আমাদের গ্রাম কেশবপুর। এ গ্রাম থেকে একসময় যাতায়াত ব্যবস্থা তেমন সুবিধা ছিলনা। যদিও এখন গ্রামের ভেতরে পাকা রাস্তা হয়েছে। হবিগঞ্জ ৩ আসন থেকে বার বার নির্বাচিত এমপি জনাব এডভোকেট আবু জাহির মহোদয়ের উন্নয়নের ছোঁয়া আমাদের গ্রামেও লেগেছে। তিনি একবার চোখে যা দেখেন এবং যা বলেন তাই করেন। তার প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছি। অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এমপি মহোদয়কে।

খুব কষ্ট লাগে আমাদের গ্রামকে নিয়ে যখন আশপাশের মানুষ মশকারি করে। আমারা হবিগঞ্জ সদর ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার বর্তমান ১১ নং ব্রাহ্মণডুরা ইউপির একদম দক্ষিণ হয়ে শেষ মাথায় বসবাস করি। তাই আমাদের গ্রামকে অনেকেই মশকারি করে কানি গ্রাম বলতো। তখন খুব কষ্ট লাগতো। আমরা যেন তাদের কাছে হাতের পুতুল। তখন মনে মনে ওয়াদা করেছিলাম এই কানি গ্রাম থেকে এক সময় কিছু একটা করব। যদি আল্লাহ সহায় থাকে। তবে নির্বাচন করে কিছু করার ইচ্ছে আমার নেই। আমি সব সময় চেষ্টা করি আমার গ্রামের সম্মান, ইজ্জত ধরে রাখার।

যখন আমি নির্বাচন করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম তখন আমি আমার বাবা ও গ্রামবাসীকে ডেকে তাদের একটা পরামর্শ গ্রহণ করলাম। সেই পরামর্শে তেমন সারা পাইনি। তারা আমাকে অকপটে জানিয়ে দিল অন্যকোন প্রার্থীকে তারা ওয়াদা দিয়েছে। তখন ভাবলাম কাকে নিয়ে তারা ওয়াদা দিয়ছে, আমরাও তো ভোটার; আমরা তো শুনলাম না বা জানলাম না। আবার ভাবলাম আজ তারা যাকে ওয়াদা দিয়েছে যদি কেউ মারা যায় তাহলে ওয়াদাকৃত ভোট কাকে দিবে? ওয়াদা ভঙ্গকারিকে তো আল্লাহ পছন্দ করেন না।

আমি জান্তাম না যে, নির্বাচনের ছয় মাস থেকে এক বছর আগেই ভোটের জন্য কাউকে ওয়াদা দিতে হয়। ওয়াদাবদ্ধ হতে হয়। এবারই প্রথম জানলাম, প্রথম শুনলাম। কার ভোট নিয়ে কাকে ওয়াদা দেয় সেটা জানি না। আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব। এই স্লোগানটা যেন এখন আর নেই। মাত্র কয়েকজন মিলে পুরো গ্রাম নয়, পুরো ইউনিয়নের ভোট যেন চলে যায় ওয়াদাকৃত বাক্সে।

ছোট বেলায় দেখিছি যখন স্থানীয় নির্বাচন আসে তখন সমস্ত প্রার্থীরা ভোটের জন্য ভোটারের বাড়ি বাড়ি এসে তাদের দারস্থ হয়। আমাদের বাপ-দাদা-চাচা ও আত্মীয়রা ভোটের একদিন বা দুইদিন আগে বসে সিদ্ধান্ত  নেন কাকে ভোট দিবে। কে দেশের উন্নয়ন করবে, কাকে পাশে পাবে। কিন্তু এখন আর সেদিন নেই; ডিজিটাল বাংলাদেশে ফোনের মাধ্যমেই এক বছর আগেই ভোট কেনা-বেচা শুরু হয়।

যা হোক আমি সেদিকে যাব না। গ্রামবাসীর কথাশুনে সিদ্ধান্ত নিলাম নির্বাচন করব না। আমার এ সিদ্ধান্ত শুনে বাবার মনটাও ঘাবরে গেল। খুব আশা করেছিলো বাবা। পাশাপাশি সকল বন্ধুদের মনও ঘাবরে গেলো। চলে আসলাম ঢাকায়, কোন খোঁজ-খবর নেই। নিজের মত করে এগিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন ৫ম দফায় উপজেলা নির্বাচনের ঘোষণা করে। নবগঠিত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় নির্বাচনের সময়সূচি দেয় ১৮ জুন।

ঘোষণা শুনে হঠাৎ বাবা আমাকে ফোন করেন নির্বাচন নিয়ে একটু ভাবার জন্য। পাশাপাশি অনেক সহকর্মীরাও উৎসাহ দিতে থাকে। কি করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। অনেক চিন্তা-ভাবনা করার পর আবারও সিদ্ধান্ত নিলাম নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করব।

এদিকে মনোনয়নের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর হবিগঞ্জ থেকে প্রচুর ফোন আসা শুরু হয়। সেখানকার বন্ধুরা সব আমাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অনেকেই ফোন করে এবং এসএমএস পাঠিয়ে অভিনন্দন জানান। রাজধানীতেও আমার পরিচিত সবাই অভিনন্দন জানান।

রক্তের সম্পর্ক না হলেও মানুষের অনুভূতি যে কী রকম হয়, এটা আমি বুঝলাম। নির্বাচন করব শুনে স্বল্পদিনের পরিচিত এক ছোটবোন আনন্দে কেঁদেছেন।

আমার এক প্রিয় বন্ধু (যুগ্ম সচিব) যার সঙ্গে  প্রায় প্রতিদিন খাবার খাই। সেও নির্বাচন করার আশ্বস্থ দিলেন।

শুধু তাই নয়, আমার চাকরিস্থল স্যাটেলাইট (আনন্দ টিভি) সহকর্মীরা সম্মতি দিয়েছেন যেন নির্বাচন করি। এশিয়ান টিভির এক বড় ভাইও বললেন নির্বাচন কর। এভাবে আশপাশের ভালোবাসার প্রিয় মানুষ সবার একটাই বক্তব্য, এমন সুযোগ জীবনে বারবার আসবে না। এ সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। তাদের পরামর্শ, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে হয় না। তবে একটি প্রশ্ন বারবার মনে উঁকি দিচ্ছে, যে আমি আমার গ্রামের সম্মান রক্ষার স্বার্থে এত বড় সিদ্ধান্ত নিলাম, তারা কি আদৌ কোনো দিন এ কথা স্মরণে রাখবে?

না, রাখেনি। আবারও বাধা। আমার বাবার মত আমাকে থামিয়ে দিল একতার ডাক আর অন্যজনকে দেয়া ওয়াদা। শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীর বাধার মুখে আর হয়ে উঠেনি নির্বাচনে অংশ নেয়া। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়; নির্বাচনে অংশ নেয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিষয়। যা হোক, আমি আমার আমার গ্রাবাসীর কথা রাখতে গিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালাম। তাদের ইচ্ছাই যেন হয় আগামী দিনের উন্নয়নের শক্তি। তবে এখানে আমার দৃঢ় বিশ্বাস! একদিন না একদিন আমার গ্রামবাসী আমাকে সমর্থন জানাবে। আর সেদিনের অপেক্ষায়…..

নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছে। একজনকে জয়ী হতে হবে। আমি জয়ী হব তা বলছি না। আমি চাই আমার গ্রাম যেন ভবিষ্যতে গর্ব করতে পারে কানি গ্রাম থেকেও নির্বাচন করা যায়। আমরা কারো হাতের পুতুল নই। আমরা পারি। আজ হউক কাল হইক একদিন আমরা বিজয় ছিনিয়ে আনব ইনশাআল্লাহ।

তবে এখানে একটা কথা না বলে পারছি না, আজ যারা আমাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলে দুরে রেখেছিলো, যারা বলেছিলো আমরা অন্যজনের কাছে ওয়াদাবদ্ধ হয়ে আছি। নির্বাচনের সময় দেখলাম তারাই ওয়াদাকৃত ব্যাক্তিকে ছেড়ে অন্য জনের পিছনে ঘুর ঘুর করছে। কোথায় গেল আপনাদের ওয়াদা?

নির্বাচন করব কী করব না, এ দ্বিধায় গত এক মাস আমি আমার বাবা ও আমার পরিবারের প্রত্যেকটা সদস্য একদিনও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। জীবনের কঠিন সময়ে কীভাবে তারা পরিবারের একজন সদস্যকে মানসিক শক্তি যোগাতে হয় তার প্রমাণ দিয়েছিলো তারা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহলের বেশ কিছু বন্ধু আমার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েও রেখেছে। কৌশলগত কারণে আমি তাদের নাম প্রকাশ করে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারছি না। তাবে তাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। যারা আমার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন তাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে আমার গ্রামের সব ভোটারের প্রতিও ভালোবাসা রইল। প্রার্থী হলে জয়ী হব কিনা জানি না; তবে জয়ী হই বা না হই আমি সারাজীবন আপনাদের পাশেই থাকব। বিশ্বাস করি আপনারাও আমাকে আপনাদের সঙ্গেই রাখবেন। আমি আপনাদেরকে, আমার গ্রামকে অনেক অনেক ভালবাসি। গর্ব করি, অহংকার করি।

লেখক:

সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

সম্পাদক ও প্রকাশক- চেকপোস্ট

Print Friendly, PDF & Email

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 Checkpost Media
Design & Developed BY ThemesBazar.Com
error: Content is protected !!